ধর্মশিক্ষার সংস্কার করেই ধর্মসন্ত্রাস বন্ধ করা সম্ভব

এ এস এম সাজ্জাদ হোসাইন  :

ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে যেমন বহু মহামানব আছে, তেমনি বহু মহাদানবও আছে। অবিশ্বাসীদের মধ্যেও প্রচুর মহামানব আছে, তবে মহাদানব কিংবা পাতিদানব থাকার ঘটনা বিরল। অর্থাৎ যারা ধর্ম পালন করে না, তাদের মধ্যে দানব খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ধার্মিকদের মধ্যে দানবই শুধু নয়, এখন মহাদানবেরও অভাব নেই। এর প্রকৃত কারণ না খুঁজে, বিজ্ঞজনেরা (প্রায় সকলেই) নানা উপদেশ ও পরামর্শের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। তাদের পরামর্শ যে একেবারে ফালতু, তা নয়, তবে মূল কারণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন।

ধর্ম যদি এতো ভালো জিনিসিই হবে, তাহলে ধর্মপালনকারীদের মধ্যে একটি দানবও থাকার কথা নয়। অথচ আমরা কী দেখছি? ধর্মকে ব্যবহার করে, ধর্মের নামে, যে পরিমাণ ঘৃণা মানুষের মনে (সবাই নয়) সৃষ্টি করা হচ্ছে, এর ১%ও কী অন্য কোন দর্শন বা মতবাদ দ্বারা সৃষ্টি করা সম্ভব? তথাপিও ধর্মই সকলের কাছে কীভাবে যে প্রিয় ও মহান, এ মূর্খের বোধগম্য নয়। সাধারণ ধার্মিক থেকে শুরু করে বিদ্বান ধার্মিকগণ প্রায় সব হত্যাযজ্ঞের পরেই বলেন, এরা ধার্মিক না, এরা ধর্মকে অপব্যবহার করছে… ইত্যাদি। প্রশ্ন হচ্ছে, যে জিনিসের সৃষ্টি হয়েছে অপব্যবহৃত হতে, মানবতা ধ্বংসের জন্য, তা অপব্যবহৃত হবে না তো, কী হবে? যা সত্য, যা খাঁটি তা কখনোই, কোনোভাবেই অপব্যবহার হতে পারে কী? অতএব, কোনো ধার্মিক কখনোই ধর্মকে খারাপ বলে না, যদিও এটিকে ব্যবহারে করেই বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নারকীয় সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটছে। তারা একথাও স্বীকার করতে নারাজ যে, ধর্মের মধ্যেই সন্ত্রাসের বীজ রয়েছে। তাই যদি না-ই হবে, তাহলে কীভাবে ধর্মের নামে, ধর্মের শ্লোগান দিয়ে, এমন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটে এবং যারা এসব ঘটায় তারা কোনো না কোনো ধার্মিক পিতা-মাতার সন্তান, কোনো না কোনো ধর্মজীবিই তাদের দীক্ষাগুরু। পিতা-মাতা, ধর্মগুরু কিংবা সমাজ যদি তাদের শিশুকালে ভুল ধর্মশিক্ষা না-ই দিতো, তাহলে তারা এতোবড় মাপের দানব হতো কী? হলে, ব্যাখ্যা করুন। শিশুকালে যদি দানবীয় ধর্মশিক্ষা দেয়া হয়, তাহলে তার কাছ থেকে ভালো ফল পাওয়ার চিন্তা বৃথা। কারণ প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষভাবে ধর্মশিক্ষার প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো, extremism বা চরমপন্থা। যেমন, শিশুকালেই গুরুজনেরা (ধর্মশিক্ষকসহ) নিজেদের ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে, বজায় রাখতে, অন্য ধর্মের প্রতি শিশুকে অশ্রদ্ধাশীল করে তোলে। যা কখনোই ভোলা যায় না। অতএব ধর্ম ও ঘৃণা গলাগালি করেই থাকে। তবে ধর্ম পালিত হয় প্রকাশ্যে, পক্ষান্তরে ঘৃণা এবং কট্টোরবাদিতা থাকে নিরবে। যখন কেউ তা উষ্কে দেয়, তখই গুলশান ম্যাসাকারের ন্যায় প্রকাশ পায়, নতুবা নয়। মাদ্রাসা শিক্ষার বাইরে থাকলেও, পরিবার এবং সমাজের ধর্মশিক্ষার বাইরে এরা কেউই ছিলো না। পরিবার ও সমাজে যে কট্টোরপন্থি নেই তা তো নয়, প্রচুর আছে। তাই এদের সংশোধন না করে, কীভাবে আপনার শিশুকে রক্ষা করবেন? শুধু ধর্মজীবি বা ধর্মপ্রতিষ্ঠানই যে ভুল ধর্মশিক্ষা দিচ্ছে তা নয়, পরিবার ও সমাজও একই প্রক্রিয়ায় ভুল শিক্ষা দিচ্ছে। অতএব, উচ্চশিক্ষিতদের সন্ত্রাসী হওয়ার পেছনে যেসব পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যা থাকুক না কেনো, ভুল ধর্মশিক্ষাই সর্বপ্রধান সমস্যা, যা নিয়ে কারো মুখে রা নেই।

মানুষ যতোক্ষণ নিজেকে চালায় ততোক্ষণ সে মানুষ থাকে, যখন ভাইরাস (ধর্মভাইরাস) মানুষকে চালায়, তখন আর মানুষ থাকে না। অর্থাৎ মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি-বিবেক সব ভাইরাসের হাতে সমর্পণ করে, তখন ওটার দ্বারাই চালিত হতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় কোনো পথ থাকে না। বিশ্বাস না হলে- পশ্চিমের দিকে তাকান, দেখুন, ধর্মশিক্ষা পরিবর্তন করার ফলেই আজ তারা এ ভাইরাস থেকে প্রায় মুক্ত। সন্ত্রাস সম্পর্কে বিদ্বানগণ অনেক পরামর্শ দিলেও এ ভাইরাসমুক্ত হওয়ার পরামর্শ কেউই দিচ্ছেন না। জানি, আমার মতো মূর্খের তোলা প্রশ্নে কেউই একমত হবেন না, তবুও বলছি, ধর্মশিক্ষার আমূল পরিবর্তন ব্যতিত, দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। কারণ মানুষ অভ্যেসের দাস এবং মানুষ যা জন্মগতভাবে লাভ করে, তা ভালো কিংবা মন্দ বিচার করার ক্ষমতা এবং ইচ্ছা দুটোই হারিয়ে ফেলে। আবার বিচার করতে গেলেও যেহেতু ধর্মসন্ত্রাসীদের দ্বারা আক্রান্ত হয় (যেমন আমরা, বাইরে তো বটেই, কারো কারো ঘরেও নিরাপত্তা নেই)। তাছাড়া এ ভারাইস আক্রান্তরা ঈশ্বর ভয়ে যেমন ভীত ও সদা আতঙ্কগ্রস্ত থাকে, তেমনি ঈশ্বর রক্ষার নামে মরিয়া থাকে, ফলে কেউ প্রশ্ন তুলতেই সাহস পায় না। যারা তুলেন, তারা অত্যন্ত কঠিন হৃদয়ের মানুষ বলেই, তা পারেন। অতএব অতি সহজে এ ভাইরাস ত্যাগ করা যেমন সম্ভব নয়, বরং ত্যাগ করতে গেলে বা চেষ্টা করলে, আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরে। অতএব এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা এবং সেটা শুরু করতে হবে প্রথমত পরিবার, সমাজ ও ধর্মালয় বিশেষ করে ধর্মজীবিদের মধ্যে। আমার পরামর্শে ও ভাবনায় ভুল থাকতেই পারে। তবে বৃহৎ জ্ঞানের অধিকারীদের (বিদ্বানদের) পরামর্শ ও ভাবনায় ভুল হওয়ার কথা নয়। কারণ বিদ্বানদের বক্তব্য আমরা সাধারণেরা বিনা প্রশ্নে মেনে নেই। যে বীজ হাজার হাজার বছর ধরে রোপিত হয়ে আসছে, সেই বীজ ধ্বংস করতে যে শতশত বছর লাগবে না, তাও মনে করি না। তবে একাজ শুরু করা অতীব জরুরি। কারণ এমনিতেই বহু দেরি হয়ে গেছে, যতো দেরি করবেন ততো ভুগবেন। আজ আপনি মরছেন, কাল আমি, পরশু তিনি…। তাই দয়া করে, জরুরি ভিত্তিতে মূল বা শেকড়ে হাত দিন, আসল কাজটি কীভাবে করা যায় সেই পরামর্শ দিন। অনুগ্রহ করে এসব চিন্তা বাদ দিয়ে, সবার আগে ধর্মকে প্রশ্ন করতে শিখুন। ধর্মপুস্তকগুলো পড়ারও অনুরোধ রইলো। বোধকরি আপনারা, যারা এসব বলেন, তারা কেউই, কোনোদিনও ধর্মপুস্তক পড়েননি, যা শুনেছেন তাই বিশ্বাস ও ধারন করেই আজীবন চলেছেন (এটাই অন্ধবিশ্বাস)।

সর্বপ্রথমেই পরিবার, সমাজ, ধর্মজীবিদের সাবধান করতে হবে। তাদের প্রতি কঠিন দৃষ্টি রাখতে হবে, যাতে তারা এরূপ ধর্মশিক্ষা না দেয়। যেমন, অন্য ধর্ম মিথ্যা-বানোয়াট, ঘৃণ্য-জঘন্য, নিজেদেরটা মহৎ, সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বসত্য… এসব কোনো অবস্থাতেই, কোনো পরিসি’তেই শিশুকে শেখানো যাবে না। যারা শিখে ফেলেছে তাদের সংশোধন আর সম্ভব না, তবে যারা এখনো শিখেনি অর্থাৎ শিশুদের যেন কোনো অবস্থাতেই এসব শিক্ষা দেয়া না হয়। যেহেতু শিশুর এ শিক্ষার হাতেখড়ি পরিবারে, পরবর্তীতে সমাজে ও ধর্মালয়ে, সেহেতু পরিবারগুলোর প্রধান এবং ধর্মীয় নেতাদের ট্রেনিং দিতে হবে, তারা ধর্মের কতোটুকু শিখাতে পারবে, কিংবা পারবে না। অতএব ধর্মশিক্ষার পরিবর্তন ছাড়া ধর্মসন্ত্রাস বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।



চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক : মনির চৌধুরী, সম্পাদক: মো: মোফাজ্জল হোসেন, সহকারী সম্পাদক : মোঃ শফিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালকঃ সৈয়দ ওমর ফারুক, নির্বাহী সম্পাদক: ঝরনা চৌধুরী।

সম্পাদকীয় কার্যালয়: ১২ পুরানাপল্টন,(এল মল্লিক কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা)মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
ফোন বার্তা বিভাগ: ০২-৯৫৫৪২৩৭,০১৭৭৯-৫২৫৩৩২,বিজ্ঞাপন:০১৮৪০-৯২২৯০১
বিভাগীয় কার্যালয়ঃ যশোর (তিন খাম্বার মোড়) ধর্মতলা, যশোর। মোবাইল: ০১৭৫৯-৫০০০১৫
Email : news24mohona@gmail.com, editormsangbad@gmail.com
© 2016 allrights reserved to MohonaSangbad24.Com | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com