কর্ণফুলী তীরে সাড়ে ২৭ হাজার টর অ্যামোনিয়ার ট্যাংক

বি নিউজ রিপোর্ট :

কর্নফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় মাত্র এক কিলোমিটার দূরত্বের  মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২৭ হাজার টন অ্যামোনিয়া ধারণ ক্ষমতার চারটি ট্যাংক। এর মধ্যে সোমবার বিস্ফোরিত ট্যাংকটিতে অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ ছিল মাত্র দুইশ’ টন। এই অ্যামোনিয়া নি:সরণে পরিবেশ -জীব বৈচিত্রের ক্ষযক্ষতির যে চিত্র আসছে তাতে যে কোন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগে নিরাপত্তা সুসংহত করার বিষয়ে এখনই নানা চিন্তা শুরু হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন এত ছোট জায়গায় সাড়ে ২৭ হাজার টন অ্যামোনিয়া রাখার ট্যাংক সম্ভবত বিশ্বের আর কোথাও নেই। তারা এও বলছেন,অ্যামোনিয়া  ট্যাংক থাকাটাই বিপদের কারণ বলা যাবে না, বড় কথা হচ্ছে সেগুলো কিভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। সোমবার ডিএপি সারকারখানায দুর্ঘটনার পর মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অ্যামোনিয়া ট্যাংকের রক্ষণাবেক্ষণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
আনোয়ারার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় বিসিআইসির মালিকানাধীন ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেটের (ডিএপি) পাশেই রয়েছে বহুজাতিক মালিকানার কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো), তার পাশে বিসিআইসির মালিকানার আরেক সারকারখানা চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। সার উৎপাদনে কাফকোতে ২০ হাজার টন অ্যামোনিয়া গ্যাস ধারণ ক্ষমতার একটি, সিইউএফএলে ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার একটি ও ডিএপিতে ২ হাজার টনের একটি ও ৫শ’ টনের আরেকটি ট্যাংক আছে। এর মধ্যে ডিএপির পাঁচশ’ টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকটি সোমবার বিস্ফোরিত হয়। সবগুলো ট্যাংক এক কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের মধ্যে অবস্থিত।
সারকারখানা পরিচালনায় সম্পৃক্ত প্রকৌশলীরা জানান, সাধারণত কারখানাগুলোয় অ্যামোনিয়া স্টোরেজ ট্যাংকের পুরুত্ব হয় ১৬-১৮ মিলিমিটার। সোমবার বিস্ফোরিত চীনা প্রযুক্তিতে তৈরি ডিএপির ট্যাংকটির পুরুত্ব ছিল মাত্র আট মিলিমিটার। তবে সিইউএফএল ও কাফকোর বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, তাদের ট্যাংক নিয়ম মেনেই যথাযথ পুরুত্বে বানানো। যা ভূমিকম্প, প্রাকৃতিক দুর্যোগেও দাড়িয়ে থাকার ক্ষমতা রাখে।
তারপরও সোমবারের দূর্ঘটনায় নড়েপড়ে বসেছে প্রতিষ্ঠানে কর্তাব্যক্তিরা। কাফকো, সিইউএফএল, ডিএপি ছাড়াও নদীর ওপারের টিএসপি সারকারখানার মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) পদমর্যাদার চার কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি বিশেষ কমিটি হতে যাচ্ছে । এই কমিটি সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশ, বাতাস ও পানিতে নি:সরিত অ্যামোনিয়া গ্যাসের পরিমাণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে বড় কোন বিপদে পড়তে না হয় সেজন্য করণীয় নির্ধারণে কাজ করবে।
এদিকে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী রাঙ্গাদিয়ার যে এলাকায় সার কারখানাগুলো অবস্থিত, তার পাশ দিয়েই তৈরি হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম কর্ণফুলী টানেল। আগামী অক্টোবরে ভিত্তি স্থাপিত হবে চীনের অর্থায়নে নির্মিত এই টানেলের। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নতুন এই টানেল নির্মাণে সিইউএফএল গেইট ও অপর পাড়ের ১৫ নম্বর ঘাট পয়েন্টে নদীর তলদেশে বসবে প্রশস্ত টিউব। তাতে নদীর ৩৫ মিটার নীচে নির্মিত হবে সাড়ে ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল। সেই সঙ্গে থাকবে ৬ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক। এই টানেলের অ্যালাইনমেন্ট হবে এয়ারপোর্ট থেকে কর্ণফুলী নদীর দুই কিলোমিটার ভাটির দিকে। টানেলের প্রবেশপথ হবে নেভি কলেজের কাছে এবং বহির্গমন পথ হবে সার কারখানার কাছে। টানেল নির্মাণ করা হবে ‘শিল্ড ড্রাইভেন মেথড’ পদ্ধতিতে।
বিশাল এই কর্মযজ্ঞে সাড়ে ২৭ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার চারটি অ্যামোনিয়া ট্যাংকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে কীভাবে ? এ প্রশ্নে কাফকোর চিফ অপারেশন অফিসার (সিওও) আজিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, টানেল নির্মাণে সংযুক্ত বিশেষজ্ঞদের কাছেও আমরা জানতে চেয়েছি নির্মাণ কাজে ‘ভাইব্রেট’ (কম্পন) কতটুকু হতে পারে ? এখনও জবাব আসেনি। জবাব পেলে সে অনুযাযী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে কাফকোতে ২০ হাজার টন অ্যামোনিয়া ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ট্যাংক রয়েছে। বেশ কিছুদিন কারখানার উৎপাদন বন্ধ থাকায় ট্যাংকে মজুদ অনেক কমে এসেছে। তারপরও যেকোন পরিস্থিতি মোকাবেলায আমরা সবসময সতর্ক। ডিএপি দুর্ঘটনায়ও কাফকোর নিরাপত্তা টিম উদ্ধার অভিযান ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অগ্রণী ভ’মিকা রেখেছে।
সিইউএফএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) গোলাম মর্তুজা জানান, টানেলের একটি মুখ সম্ভবত সিইউএফএলের পাশ দিযে যাবে। টানেলের প্রাক সমীক্ষায় টানেল বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সিইউএফএলের বিশেষজ্ঞরাও যৌথভাবে কাজ করেছে। সরকার যা করবে ভেবেচিন্তে করবে, এতে ঝুঁকি বা চিন্তার কারণ নেই। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে কোন ধরনের অনাকাংখিত পরিস্থিতি এড়াতে অ্যামোনিয়া ট্যাংক নিয়ে আমরা অনেক বেশি সতর্ক। বৃহস্পতিবারও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেছি। সিইউএফএলের ৫ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংকে বর্তমানে ২ হাজার টনের মত অ্যামোনিয়া আছে। ট্যাংকের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে, লোকবলও বাড়ানো হয়েছে।
ডিএপি’র মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) আলমগীর কবির বলেন, কর্ণফুলী তীরের চার সার কারখানার মহাব্যবস্থাপকদের নিযে একটি বিশেষ কমিটি হচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি ও সার্বিক নিরাপত্তা বিষয়ে এই কমিটি কাজ করবে। ভবিষ্যতে যে কোন ধরনের বিপদ এড়াতে স্থায়ী সমাধানের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া দূর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে  ১০ সদস্যের বিসিআইসির কমিটি কাজ করছে।
মৎস্যখাতে সোয়া কোটি টাকার ক্ষতি :
ডিএপি থেকে নি:সরিত অ্যামোনিযা গ্যাসে পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হলে তার আর্থিক হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তাছাড়া দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে তা খতিয়ে দেখতে কাজ করছে বিসিআইসির টিম। শুধুমাত্র মৎস্য খাতে ক্ষতির একটি সরকারি হিসাব পাওয়া গেছে।
উপজেলা মৎস্য বিভাগের মাঠ কর্মকর্তা জাহেদ আহমদ জানান, মৎস্য খাতে এ পর্যন্ত  কোটি ২৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ক্ষতির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৯২ দশমিক ৭১ একর আয়তনের ৬ পুকুর ও ৫ মৎস্যখামারে অ্যামোনিয়া গ্যাস মিশ্রিত পানি ঢুকে পড়ার প্রমান পাওয়া গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েয়েছেন ৫৫ চাষী। মারা গেছে ৩৫.৮০ মেট্রিক টন মাছ। এর মধ্যে ৬.৬০ টন চিঙড়ি, ২৯.২০টন রুই জাতীয় মাছ রয়েছে।



চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক : মনির চৌধুরী, সম্পাদক: মো: মোফাজ্জল হোসেন, সহকারী সম্পাদক : মোঃ শফিকুল ইসলাম, ব্যবস্থাপনা পরিচালকঃ সৈয়দ ওমর ফারুক, নির্বাহী সম্পাদক: ঝরনা চৌধুরী।

সম্পাদকীয় কার্যালয়: ১২ পুরানাপল্টন,(এল মল্লিক কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা)মতিঝিল, ঢাকা-১০০০।
ফোন বার্তা বিভাগ: ০২-৯৫৫৪২৩৭,০১৭৭৯-৫২৫৩৩২,বিজ্ঞাপন:০১৮৪০-৯২২৯০১
বিভাগীয় কার্যালয়ঃ যশোর (তিন খাম্বার মোড়) ধর্মতলা, যশোর। মোবাইল: ০১৭৫৯-৫০০০১৫
Email : news24mohona@gmail.com, editormsangbad@gmail.com
© 2016 allrights reserved to MohonaSangbad24.Com | Desing & Development BY PopularITLtd.Com, Server Manneged BY PopularServer.Com